নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশে ট্রেন ভ্রমণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত আকর্ষণ। ব্যস্ত নগরজীবন থেকে ছুটি নিয়ে যারা প্রকৃতির কাছে যেতে চান, অথবা ক্লান্ত মনকে একটু বদলে নিতে চান—তাদের কাছে ট্রেন হচ্ছে সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ এবং সবচেয়ে স্মৃতিময় একটি যাতায়াত মাধ্যম। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের ট্রেনযাত্রা তো সেই অভিজ্ঞতাকে আরও রঙিন করে তোলে। সমুদ্রের টানে মানুষ যতটা আকুল হয়, ঠিক ততটাই প্রশান্তি পাওয়া যায় সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার যাত্রায়। এই লেখায় আমি তুলে ধরছি আমার নিজের সেই ভ্রমণের গল্প—যেখানে রয়েছে উত্তেজনা, মানুষের গল্প, প্রকৃতি, শব্দ, গন্ধ আর অনুভূতির রঙিন মেলবন্ধন।
আরও পড়ুন:
টিকিট কাটা থেকে যাত্রার উত্তেজনা
একেকটি যাত্রার শুরু হয় টিকিট কাটার মধ্য দিয়ে, আর টিকিট কাটা নিয়েই তৈরি হয় প্রথম উত্তেজনার আসর। কক্সবাজারগামী ট্রেন এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাই টিকিট পেলেই যেন নিজের মধ্যে সমুদ্রের গন্ধ পেয়ে যাই। টিকিট সংগ্রহের পর থেকেই শুরু হয় ভ্রমণের প্রস্তুতি—ব্যাগ গোছানো, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়া, মোবাইল চার্জ দেওয়া, প্লেলিস্ট সাজানো—এসব করতে করতে মনে হয় যেন সমুদ্র ইতোমধ্যেই চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
যাত্রার আগের রাতটা সাধারণত ঘুমহীন হয়ে যায়। ঢাকা শহরের ব্যস্ততার ভেতরেও সেই রাতে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। কারণ সামনের দিনটায় অপেক্ষা করছে দীর্ঘ রেলপথ এবং নতুন সব দৃশ্য দেখে হৃদয় ভরে ওঠার অনুভূতি।

স্টেশনে পৌঁছানোর পরের কোলাহল
কমলাপুর রেলস্টেশন আমার কাছে সব সময়ই বিশেষ। সেখানে প্রতিবার গেলে মনে হয় বাংলাদেশকে একসঙ্গে দেখা যায়—বয়স, পেশা, ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক—সকল বৈচিত্র্যের মানুষের মিলনস্থল। কক্সবাজারগামী ট্রেনের দিনটিও ভিন্ন ছিল না।
স্টেশনভর্তি কোলাহল—বাচ্চাদের হাসি-চিৎকার, মায়েদের ব্যস্ততা, যাত্রীদের দীর্ঘশ্বাস, স্টেশনের চায়ের গন্ধ, আর ট্রেনের হুইসেল। যেন একটা আলাদা দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছি।
কানের কাছে শোনা যায় পরিচিত ডাক—
“চা লাগবে? গরম চা!”
“ডিম টোস্ট!” “বিরিয়ানি, বিরিয়ানি নেন!” “এই মুড়ি!” “শষা!” “আমড়া!”… ইত্যাদি।
স্টেশনের এই ব্যস্ততা আমার কাছে একধরনের আনন্দ। এখানে মানুষ আসে বিভিন্ন গল্প নিয়ে—কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাবে, কেউ অফিসের ছুটি কাটাবে, কেউ হয়তো সমুদ্র দেখতে যাচ্ছে জীবনে প্রথমবার। এই গল্পগুলোর ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই ট্রেন এসে থামে ঠিক আমার সামনে। বিস্তৃত দেহ নিয়ে যেন ডাক দেয়—চল, একসাথে এক নতুন অভিযানে যাই।
ট্রেনে উঠার পরের ভিয়ারেজ
ট্রেনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আসল গল্প—ট্রেনের ভিয়ারেজ। এই ভিয়ারেজ শব্দটি হয়তো শহুরে অভিধানে পাওয়া যাবে না, কিন্তু বাস্তবে ট্রেনের কোচের মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য থাকে—তাকে ভিয়ারেজ বলাই যায়।
কেউ ব্যাগ রাখছে, কেউ সিট খুঁজছে, কেউ আবার সিট পেয়ে আনন্দে ভরপুর। পাশের সিটে বসা লোকটির সঙ্গে মুহূর্তেই কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। পরিচিতি, পেশা, ভ্রমণের কারণ—এসব নিয়ে এমনভাবে গল্প জমে ওঠে যেন বহুদিনের বন্ধুত্ব। ট্রেনের এই আকর্ষণটাই অন্য—এখানে মানুষ অচেনা হয়েও গল্পে খুব সহজে জড়িয়ে যায়।
আমি জানালার পাশে বসেছিলাম। জানালার বাইরের হাওয়া এসে মুখে লাগতেই যাত্রা শুরু হওয়ার ঢং টের পাওয়া যায়। ট্রেন ধীরে ধীরে ছুটতে শুরু করলে মনে হচ্ছিল শহরটাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলেছি এক নতুন দৃশ্যপটে।

ট্রেনের শব্দ, প্রকৃতির ছন্দ
ট্রেনের চাকচিক বা “ক্ল্যাটার-ক্ল্যাটার” শব্দের একটি ছন্দ আছে। সেই ছন্দ আমার কাছে খুব বেশি কবিত্বপূর্ণ মনে হয়। ট্রেন যখন শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে এগোতে থাকে, তখন জানালার দৃশ্য বদলে যেতে শুরু করে।
পাল্টে যায় আকাশের রঙ, পাল্টে যায় বাড়ির আকার, পাল্টে যায় মানুষের তাল। শহরের জ্যাম, শব্দ আর দালানের পর ছিল সবুজ ফসলের মাঠ, ছোট নদী, খালের ওপর বাঁশের সাঁকো, হঠাৎ দেখা পাওয়া সোনালি রোদে ঝিলমিল ধানের শিষ।
একেকটি দৃশ্য যেন জীবন্ত ছবি হয়ে ওঠে।
কখনও দেখা যায় নৌকা বেয়ে যাওয়া জেলেদের, কখনও সবুজের ভেতর হারিয়ে থাকা নির্জন মাঠ। ট্রেনের গতির সঙ্গে সঙ্গে মনও হালকা হতে থাকে, যেন সব ক্লান্তি সেই রেললাইনে পড়ে থাকে পিছনে।
যাত্রীদের গল্প—আনন্দ, হাসি ও মানবিকতা
ট্রেনের ভিয়ারেজ মানেই শুধু দৃশ্য দেখা নয়—এখানে মানুষের গল্পও বড় হয়ে ওঠে।
আমার বিপরীতে বসা ছিল এক দম্পতি, সঙ্গে তাদের ছোট ছেলে। ছেলেটি সমুদ্র দেখবে জীবনে প্রথমবার—তার উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছিল সমুদ্র যেন পৃথিবীর আশ্চর্য কোনো জিনিস। তার ছোট ছোট প্রশ্ন,
“সমুদ্র কি অনেক বড়?”
“ঢেউ কি ভয়ংকর?”
“আমরা কি সাঁতার কাটব?”
এই শিশুর আনন্দ ট্রেনের ভেতরটাকে আরও রঙিন করে তুলেছিল।
অন্যদিকে পাশের সিটে ছিলেন একজন বৃদ্ধ লোক। তিনি যাচ্ছিলেন তার মেয়ের পরিবারে বেড়াতে। বললেন, “বয়স বাড়লেও সমুদ্রের ডাককে থামানো যায় না বাবা।” এই একটি বাক্য আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।
আরেক পাশে ছিল কিছু বন্ধু—হাসি, গান, গল্প, সেলফি—তাদেরই যেন ট্রেনযাত্রার প্রাণ। তাদের তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বাস পুরো কোচটাকে জীবন্ত করে তুলেছিল।
এই মানুষগুলোই ট্রেন ভ্রমণের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। কারণ এখানে মানুষ শুধু যাত্রী নয়, তারা যাত্রার গল্প।

ট্রেনের চা—ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী
বাংলাদেশে ট্রেন ভ্রমণ বলে কথা—চা ছাড়া কি হয়?
ট্রেন থামলেই উঠে আসে চায়ের ভ্যান।
“চা লাগবে? গরম চা!”—এই পরিচিত ডাক আমার কাছে ভ্রমণের একটা আবেগ।
গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকালে যাত্রার রোমাঞ্চ যেন আরও বেড়ে যায়। সেই চায়ের সঙ্গে থাকে বিস্কুট বা টোস্ট—এ যেন অভ্যাস, আনন্দ আর nostalgia-এর মিশ্রণ।
রাতের পথে ট্রেন—নীরবতা ও নির্জনতায় অন্যরকম অনুভূতি
যদি যাত্রা রাতের হয়, তবে অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। ট্রেন যখন অন্ধকার গ্রামের ভেতর দিয়ে ছুটে যায়, জানালার বাইরে শুধু মাঝে মাঝে দেখা যায় দূরের আলো। সবকিছু যেন রহস্যময়, শান্ত, নির্জন।
রাতের ট্রেন মানুষের মনকে আলাদা রোমান্টিকতায় ভরিয়ে তোলে। কেউ আলো নিভিয়ে ঘুমায়, কেউ গল্প করে, কেউ আবার জানালায় তাকিয়ে থাকে নীরবে। রাতের ট্রেনযাত্রা সবসময়ই আমাকে চিন্তাশীল করে তোলে—জীবন, সময়, পথচলা—সব নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে।
গন্তব্যের শেষপ্রহর—উত্তেজনার চূড়ান্ত মুহূর্ত
কক্সবাজারের কাছাকাছি পৌঁছানোর মুহূর্তেও ট্রেনের ভিয়ারেজ থেমে থাকে না। সবাই তখন সমুদ্রের উত্তেজনায় ভরপুর। শিশুদের হাসি, বড়দের কথোপকথন, মোবাইল বের করে ছবি তোলা—প্রতিটি মুহূর্তে যেন আনন্দের স্রোত।
স্টেশনে পৌঁছে ট্রেন থামার পর যে অনুভূতি আসে—তা বর্ণনাতীত। ট্রেন থেকে নামলেই যেন মনে হয়—সমুদ্র খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।

কেন ট্রেনভ্রমণ এত রঙিন?
ট্রেনভ্রমণের রঙিনতা আসে—
✓ মানুষের গল্প থেকে
✓ প্রকৃতির বদলে যাওয়া দৃশ্য থেকে
✓ যাত্রীদের হাসি-আনন্দ থেকে
✓ জানালা দিয়ে ঢুকে যাওয়া বাতাস থেকে
✓ মুহূর্তে তৈরি হওয়া পরিচিতি থেকে
✓ রাত-দিনের আলো-বাতাসের পরিবর্তন থেকে
আর সবচেয়ে বড় কথা—ট্রেনের ভিয়ারেজ তৈরি করে এমন পরিবেশ যেখানে মানুষ সত্যিকারের ভ্রমণের স্বাদ পায়। এখানে সময় থেমে থাকে না, বরং সময়কে অনুভব করা যায়।
শেষ কথা
ঢাকা থেকে কক্সবাজারের ট্রেনযাত্রা আমার জীবনের অন্যতম রঙিন স্মৃতি। শুধু গন্তব্য নয়, পথটাও ছিল সমান সুন্দর। এই পথ আমাকে শিখিয়েছে—জীবনের আনন্দ কখনো শুধু সমুদ্র দেখায় নয়; সেই সমুদ্রের দিকে যাওয়ার পথে থাকা ছোট ছোট হাসি, গল্প, দৃশ্য এবং মুহূর্তগুলোতেই ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।
ট্রেনের ভিয়ারেজ তাই শুধু ভ্রমণ নয়—এটা জীবনের একটি রঙিন অধ্যায়, যা প্রত্যেক যাত্রীর স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।








