বুধবার, ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শুটকির গন্ধে কক্সবাজার: স্মৃতি, স্বাদ ও সংকটের উপাখ্যান

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার থেকে:

কক্সবাজার—শুধু বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর নয়, এটি একটি জীবনধারার নাম, একটি কৌতূহলের নাম, এবং ভোজনরসিক বাঙালির কাছে এক অনন্য স্বাদের ঠিকানা। কক্সবাজারে গিয়েছি কয়েকবার, প্রতিবারই নতুন কিছু দেখেছি, শিখেছি। তবে যেটি প্রতিবারই আমাকে টেনেছে, সেটি হলো শহরের রমরমা শুটকির দোকানগুলো—সেই গন্ধ, সেই ব্যস্ততা, সেই স্বাদের লোভ। এই লেখায় আমি বলবো শুটকি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শহরের শুটকি বাজারের বিবর্তন, এবং এ শিল্পকে ঘিরে চলা সম্ভাবনা ও সংকটের গল্প।

শুটকি: একটি গন্ধ, একটি পরিচিতি:

আমার প্রথম শুটকি অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না। তখন ছোট, মা শুটকি রান্না করলে সারা বাড়ি জুড়ে একধরনের ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে যেত। আমি নাক চেপে বসে থাকতাম, কখন খাবার শেষ হবে সেই প্রতীক্ষায়। কিন্তু সেই শুটকিই একদিন আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবারে পরিণত হবে, ভাবিনি কখনো।

কক্সবাজারে যখন প্রথম যাই, স্থানীয় বন্ধুরা বললো, “যদি শুটকি না খাও, তবে কক্সবাজার আসার মানে নেই।” আমি একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েও গেলাম শহরের বিখ্যাত শুটকি বাজার ঘুরতে। লাবণী পয়েন্ট, বাহারছড়া, সাগরপাড়া, বা রুমালিয়ারছড়ায় একের পর এক শুটকির দোকান—প্রতিটা দোকানে যেন একেকটা গল্প। কাঁকড়া, লইট্টা, চিংড়ি, রূপচাঁদা, ছুরি—কত রকমের শুটকি! ছোট ছোট প্যাকেট থেকে শুরু করে বিশাল বস্তা পর্যন্ত সবই সেখানে।

সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এই গন্ধটাই যেন কক্সবাজারের অলিখিত সিগনেচার।

শুটকির গন্ধে অর্থনীতি:

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে কক্সবাজার অন্যতম, যেখানে শুটকি উৎপাদন একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন শত শত জেলে সাগরে মাছ ধরেন, সেই মাছ পরে শুকানো হয় বালুখালি, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ বা চকরিয়ার শুকনা মাঠগুলোতে।

বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, দেশে বছরে প্রায় ১.৫ লাখ মেট্রিক টন শুটকি উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ কক্সবাজার থেকে আসে। জানা যায়, কক্সবাজারেই শুটকি ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২০ হাজার মানুষ। শুটকি শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও।

এই শিল্প ঘিরে গড়ে উঠেছে বহুমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রম—জেলে, ব্যবসায়ী, প্যাকেজিং শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, খুচরা বিক্রেতা, এমনকি ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানিও এখন শুটকি বিপণনে সক্রিয়।

বাজারের রূপ-রস-গন্ধ:

সাগরপাড়ের শুটকি বাজারে একবার ঢুকলে মনে হয়, আপনি ঢুকেছেন গন্ধ, শব্দ আর ব্যস্ততার জগতে। কিছু দোকানে টিনের ছাউনি, আবার কোথাও আধুনিক ফ্রিজিং সিস্টেমও দেখা যায়। কিছু দোকানে দাম লেখা প্ল্যাকার্ড, আবার কোথাও দরদাম করে নিতে হয়। শুটকির দামও নির্ভর করে কোয়ালিটির উপর। ভালো মানের লইট্টা শুটকি কেজিপ্রতি ৮০০–১২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, আবার সাধারণ কোয়ালিটির শুঁটকি ৩৫০–৫০০ টাকায় পাওয়া যায়।

আমি লাবণী পয়েন্টে এক শুটকির দোকানে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানির নাম আবদুল খালেক। তিনি বললেন, “আপা, এই ব্যবসায় আমি ৩৫ বছর। আগের মতো দাম এখন পাই না, কিন্তু কাস্টমার বাড়ছে। এখন অনলাইনে অর্ডার আসে ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে।” দোকানেই দেখলাম QR কোড ঝুলছে—কিনে নেওয়া যাচ্ছে মোবাইল পেমেন্টে।

এ যেন ঐতিহ্য আর প্রযুক্তির এক অপূর্ব সমন্বয়।

নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ:

একটি বিষয় না বললেই নয়—শুটকি ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণ। কক্সবাজারের অনেক এলাকায় বিশেষ করে মহেশখালী, টেকনাফ, এবং বাঁকখালী তীরে, হাজার হাজার নারী জড়িত আছেন মাছ শুকানোর কাজে। সকালে মাছ ধোয়া, লবণ দেয়া, বিকালে উল্টানো, রাতে আবার নিরাপদে সংরক্ষণ—সব দায়িত্ব পালন করছেন এঁরা। এ কাজে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি মনোযোগী, বললেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী।

এই নারীরাই নিজেদের পরিবার চালান, সন্তানদের পড়ান, এমনকি অনেকে নিজেদের দোকানও খুলেছেন। এ এক নিঃশব্দ বিপ্লব, যা কক্সবাজারের পাড়ায় পাড়ায় রচিত হচ্ছে।

সমস্যার গন্ধও আছে:

তবে শুটকি বাজারের গন্ধ সবসময় সুখকর নয়। পরিবেশ দূষণ, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অনিয়ম বেশ চোখে পড়ে। বিশেষ করে শুটকি শুকানোর সময় রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ আছে অনেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। যদিও সরকার ‘বিষমুক্ত শুটকি’ উৎপাদনে জোর দিয়েছে, তবুও বাজারে মিশ্র মানের শুটকি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কক্সবাজারের বাজারে ঘুরতে আসা এক ক্রেতা চিৎকার করে বললেন, “এইটা তো রাসায়নিক দেয়া, গন্ধেই বুঝতেছি!” বিক্রেতা চুপ, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বললেন, “আগে শুটকি মানে ছিল ঘরে বানানো খাবার, এখন তো সবই লাভের খেলা।”

এছাড়া কক্সবাজার শহরে থাকা বিদেশি পর্যটকরাও প্রায়শই শুটকির গন্ধ নিয়ে অভিযোগ করেন। হোটেল এলাকায় শুটকি বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও কিছু জায়গায় এখনো বেচাকেনা চলে।

সম্ভাবনার নতুন পথ:

তবে সম্ভাবনাও কম নয়। কক্সবাজারে ইতোমধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠান “অর্গানিক শুটকি” ব্র্যান্ড হিসেবে কাজ করছে। শুটকি প্যাকেটজাত করে আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে, যেন এটি শুধু গন্ধ নয়, উপহার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

‘বাংলাদেশ শুটকি সমিতি’ এখন চাইছে একটি নির্দিষ্ট ‘শুটকি হাব’ যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, এবং রপ্তানির সুযোগ থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকেও এই খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়।

বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানও এখন শুটকি বিক্রিতে আগ্রহী। ঢাকায় বসে কক্সবাজারের শুটকি পেয়ে যাচ্ছেন ২ দিনের মধ্যে। তাই বলা যায়, এটি একটি “গন্ধযুক্ত সম্ভাবনা” যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি।

আমার শুটকির বাক্স:

শেষবার কক্সবাজার থেকে ফেরার সময় ব্যাগভর্তি শুটকি নিয়ে ফিরি। রেলস্টেশনে লাগেজ নিয়ে যাওয়ার সময় একজন যাত্রী গন্ধ শুঁকে বলে ফেললেন, “আপা, লইট্টা, ছুরি নাকি চিংড়ি?” আমি হেসে বললাম, “সবগুলোই।” আমার জবাব শুনে তিনি হেসে ফেললেন।

ঢাকায় বাসায় ফিরে রান্না হলো সেই শুটকি। টক ঝাল দিয়ে, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর সরিষার তেলে ভাজা। খাওয়ার সময় আমি যেন আবারও ফিরে গেলাম সেই বাজারে, সেই গন্ধে, সেই কক্সবাজারে।

শেষ কথা:

শুটকি কেবল একটি খাদ্য নয়—এটি একটি সংস্কৃতি, একটি স্মৃতি, একটি প্রতিবেশ-নির্ভর অর্থনীতি। কক্সবাজারের শুটকি শুধু পেট ভরে না, ইতিহাসও বলে, শ্রমও বলে, সম্ভাবনাও তৈরি করে। প্রয়োজন শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারণ এবং সচেতনতা।

যদি একদিন কক্সবাজারে গিয়ে আপনি গন্ধটা না পান, বুঝে নেবেন শহরের এক অদৃশ্য আত্মা হারিয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ