আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে:
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য দিন। সেদিনের সকালটা যেন ছিল অন্যরকম। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখনও দাঁড়াবার চেষ্টা করছে নিজের দুই পায়ে। গ্রামে-গঞ্জে মানুষ তখনো খুঁজছে স্থিতি, শহরের রাস্তাঘাটে দারিদ্র্যের চিহ্ন। এমন এক সময়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষণা করলেন একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। উন্মোচিত হলো আশার নতুন দিগন্ত।
জিয়ার এই ঘোষণা কেবল একটি দলের জন্ম নয়, এটি ছিল মানুষের মনে নতুন আশার প্রদীপ জ্বালানো। দেশ তখনো বিভাজনের রাজনীতিতে বিপর্যস্ত, মানুষ চেয়েছিল এমন একজন নেতাকে, যিনি কথা রাখবেন, যিনি প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেবেন। জিয়া ঠিক তেমন একজন মানুষ ছিলেন—সাধারণ পোশাকে, সরল উচ্চারণে, দৃঢ়তায় ভরা সেই মানুষটি মানুষের চোখে ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা। একাত্তরের সেই ভয়াল রাতে চট্টগ্রামের বেতার থেকে যখন তিনি উচ্চারণ করেছিলেন “আমি মেজর জিয়া… বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছি…”, তখন পুরো জাতি নতুন করে সাহস পেয়েছিল। সেই সাহসী সৈনিকই যুদ্ধ শেষে রাজনীতির মঞ্চে এলেন, শুধু নেতা হয়ে নয়, একজন পথপ্রদর্শক হয়ে।
বিএনপির জন্ম ছিল এক ধরনের জনগণের চাহিদার প্রতিফলন। যুদ্ধের পরে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল দলে-দলে বিভক্ত হয়ে, রাজনীতির জটিল খেলায় সাধারণ মানুষের জীবন বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। জিয়া বুঝেছিলেন, দেশের উন্নয়ন শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে সম্ভব নয়, প্রয়োজন বাস্তব কাজ, প্রয়োজন মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ। তাই তিনি জাতীয়তাবাদের পতাকা উঁচিয়ে বললেন—বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি আর স্বপ্নই হবে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।

জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যে জিনিসটি মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তা হলো তাঁর সরলতা। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েও ভিড়ের মাঝে মিশে যেতেন, মানুষের সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনতেন। তিনি নিজে জানতেন দরিদ্র মানুষের কষ্ট কী, কারণ তিনি ছিলেন স্বল্পবিত্ত এক পরিবার থেকে উঠে আসা সৈনিক। তিনি বড় হয়েছেন সাধারণ জীবনে, তাই নেতৃত্বের চেয়ারে বসেও তিনি কখনো দূরত্ব তৈরি করেননি। তাঁর চোখে রাজনীতি ছিল সেবা করার মাধ্যম।
বিএনপির আদর্শ ছিল স্বনির্ভরতা। জিয়া বারবার বলতেন, “আমাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে।” তখন দেশের অর্থনীতি দুর্বল, শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি, কৃষি উৎপাদনেও ঘাটতি। জিয়া শুরু করলেন এক বিপ্লবী উদ্যোগ—‘গ্রো মোর ফুড’ কর্মসূচি। তিনি কৃষকদের প্রণোদনা দিলেন, সেচের ব্যবস্থা উন্নত করলেন, গ্রামে-গ্রামে যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করলেন। তাঁর আমলেই শুরু হলো বাংলাদেশে বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার কাজ।

আজকের অনেক তরুণ হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, কীভাবে জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার প্রথম আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছিল। সেই সময়ে ঢাকা শহরে উঁচু ভবন খুব বেশি ছিল না, রাস্তাঘাট কাঁচা ছিল, দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। তবুও মানুষ দেখেছিল এক নেতার দৃঢ় পদক্ষেপ—যিনি উন্নয়নের স্বপ্নকে কাগজে-কলমে নয়, মাঠে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
বিএনপি হয়ে উঠলো সাধারণ মানুষের দল। রাজনীতিতে এল নতুন ধারা—গণমানুষকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের মতামতকে মূল্য দেওয়া। জিয়া তার দলের ভিত্তি গড়ে তুললেন সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে। তিনি রাজনীতিকে কেবল শহুরে এলিটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, তরুণ, মেধাবী সবার হাতে তুলে দিলেন নেতৃত্বের সুযোগ।

জিয়াউর রহমান ছিলেন দৃঢ়চেতা কিন্তু বিনয়ী। একবার তিনি চট্টগ্রামে একটি সভায় গিয়েছিলেন। সেখানে সাধারণ মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমি আপনাদের সেবা করার জন্য এসেছি, নেতা হওয়ার জন্য নয়।” এই বিনয়ের জন্যই মানুষ তাঁকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছে। আজও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রবীণরা বলেন, “জিয়া সাহেব ছিলেন সত্যিকারের নেতা।”
জিয়ার হাত ধরে বিএনপি শুধু রাজনৈতিক দল হিসেবে শক্তি অর্জন করেনি, এটি হয়ে উঠেছিল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তিনি রাজনীতিতে এনেছিলেন শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা। তাঁর সময়ে দেশের অর্থনীতি প্রথমবারের মতো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে শুরু করেছিল। তিনি আধুনিকীকরণের পথে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন—যেখানে থাকবে শক্তিশালী প্রশাসন, দক্ষ বাহিনী, আর উন্নত কৃষি ও শিল্প।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যু ছিল জাতির জন্য এক বিশাল আঘাত। সেদিন কোটি কোটি মানুষ কেঁদেছিল রাস্তায় নেমে। যেন তারা হারিয়েছিল একজন অভিভাবককে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া দল বিএনপি আজও বেঁচে আছে, তাঁর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজও ১ সেপ্টেম্বরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সেই দিনের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একজন সৈনিক থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে জিয়া জাতিকে নতুন আলো দেখিয়েছিলেন।
সমালোচনা রাজনীতির অঙ্গ। কিন্তু ইতিহাসে যাঁরা বড় হয়ে থাকেন, তাঁদের অবদান অম্লান হয়। জিয়াউর রহমানও সেই অম্লানদের একজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রগঠনের প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। তিনি শুধু একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সৃষ্টিশীল রাষ্ট্রনায়ক, যিনি জাতিকে শিখিয়েছেন আত্মবিশ্বাস।

বিএনপির নাম উচ্চারণ করলে অনেকেই বলেন—“এটি কেবল একটি দল নয়, এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার দল।” সত্যিই তাই। ১৯৭৮ সালের সেই দিনে প্রতিষ্ঠিত এই দল এখনো বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। জিয়ার হাত ধরে শুরু হওয়া এই যাত্রা শুধু রাজনৈতিক দল গঠনের ইতিহাস নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরের ইতিহাস।
আজ, যখন আমরা ১ সেপ্টেম্বরের কথা ভাবি, মনে হয় এটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এক সৈনিকের স্বপ্ন কীভাবে কোটি মানুষের স্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। জিয়া সাহেবের সেই স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে, মানুষের ভালোবাসায়, বিএনপির পতাকায়, আর বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জে।
জিয়াউর রহমানের কথা বললে মনে হয়, তিনি যেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। স্বাধীনতার ঘোষণার সময় যেমন তিনি ছিলেন দৃঢ়, তেমনি রাজনীতিতেও ছিলেন দূরদর্শী। তিনি জানতেন, উন্নয়ন আর স্থিতিশীলতা ছাড়া একটি দেশ এগোতে পারে না। তাই তিনি রাজনীতিকে করেছেন মানুষের কল্যাণের হাতিয়ার।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি একটি আন্দোলনের নাম। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা, আর একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে তোলা। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজও চলমান, আর চলবে মানুষের ভালোবাসায়, ইতিহাসের শিক্ষা থেকে শক্তি নিয়ে।
তাই আজকের এই দিনে, যখন আমরা অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন শুধু একটি দলের জন্মদিন নয়, আমরা স্মরণ করি একজন দূরদর্শী নেতাকে—যিনি ছিলেন সৈনিক, রাষ্ট্রনায়ক, স্বপ্নদ্রষ্টা। বাংলাদেশের মাটিতে যতদিন মানুষের হৃদয় থাকবে, জিয়া ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির নাম ততদিন বেঁচে থাকবে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অক্ষরে।









