ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের একটি হলো কোরবানি। এটি কেবল পশু জবাই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মোৎসর্গের প্রতীক। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু হওয়া ঈদুল আযহার এই কোরবানি একদিকে যেমন তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর এক মহতী সুযোগ। তবে প্রশ্ন হলো—কোরবানি কি সবার জন্য ওয়াজিব? কাদের জন্য এটি ফরজ বা ওয়াজিব হয়েছে? এই বিষয়টি কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করাই এই কলামের মূল উদ্দেশ্য।
কোরআনের দৃষ্টিতে কোরবানি:
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেন—
> “তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত কায়েম করো এবং কোরবানি করো।”
> (সূরা কাউসার, আয়াত ২)
এই আয়াতটি প্রাথমিকভাবে রাসুল (সা.)-এর প্রতি নির্দেশনা হলেও, উম্মতের জন্যও তা অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। এছাড়া কোরআনে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে—
> “তাদের মাংস ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”
> (সূরা হজ, আয়াত ৩৭)
এটি স্পষ্টভাবে বোঝায়, কোরবানি শুধু রীতির জন্য নয়, বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাকওয়ার প্রকাশস্বরূপ।
হাদিসের আলোকে কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত:
হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
> “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।”
> (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩)
এই হাদিসটি খুবই কঠোর সতর্কবাণী বহন করে। এতে বোঝা যায়, কারও যদি কোরবানির সামর্থ্য থাকে, তবে তার জন্য তা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক ইমাম (বিশেষ করে ইমাম আবু হানিফা রহ.) এই হাদিসের আলোকে কোরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন।
কাদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব?:
ফিকহ মতে, নিচের শর্তগুলো পূরণ হলে একজন মুসলমানের জন্য কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়:
১. মুসলমান হওয়া
২. বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া
৩. আক্লবান (সচেতন ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী) হওয়া
৪. মুকিম (মুসাফির না হওয়া)
৫. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া (নিসাব হলো সেই পরিমাণ সম্পদ যা যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত; যেমন—সোনা ৭.৫ তোলা বা রূপা ৫২.৫ তোলা বা সমমূল্যের নগদ অর্থ/সম্পদ)
এই পাঁচটি শর্ত যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে পূর্ণ হয়, তবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
নারীদের ক্ষেত্রেও?
হ্যাঁ, যদি কোনো নারীর ব্যক্তিগতভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে, যদিও পরিবারের অন্য সদস্য কোরবানি দেন। অনেকেই ভুলবশত ভাবেন কোরবানি কেবল পুরুষের দায়িত্ব, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
শিশু ও মুসাফিরের ক্ষেত্রে?
যেহেতু শিশু বালেগ নয়, তাই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। একইভাবে যারা মুসাফির (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা তার বেশি দূরের সফরে আছেন এবং ১৫ দিনের কম সময় সেখানে থাকবেন), তাদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব নয়।
কোরবানির তাৎপর্য ও সামাজিক বার্তা
কোরবানি আমাদের ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের শিক্ষা দেয়। এটি সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। ধনী ও গরিব একসঙ্গে কোরবানির মাংস উপভোগ করে, যা একটি মানবিক বন্ধন তৈরি করে। তাই কোরবানি শুধু ইবাদত নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনও।
কোরবানি আল্লাহর নির্দেশিত /এক মহান ইবাদত। এটি ত্যাগের, তাকওয়ার, ও আত্মশুদ্ধির বহিঃপ্রকাশ। তাই সামর্থ্যবান মুসলমান হিসেবে আমাদের কর্তব্য—এই ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত শর্ত অনুযায়ী যদি কোরবানি আমাদের ওপর ওয়াজিব হয়, তবে তা না করা মারাত্মক গাফিলতি। আসুন, আমরা নিজেরাও কোরবানির ব্যাপারে সচেতন হই এবং অন্যদেরকেও উৎসাহিত করি।








