নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এই মাসের দশম দিনটি আশুরা নামে পরিচিত। অনেকের কাছে এটি শুধুই শোকের দিন, আবার কারো কাছে এটি আল্লাহর রহমত ও মুক্তির প্রতীক। তবে ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আশুরা একটি বহুমাত্রিক উপলক্ষ—যেখানে মিলেছে ত্যাগ, সাহস, প্রতিবাদ, ন্যায়বিচার ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত নিদর্শন।
আশুরার তাৎপর্য কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং এটি একটি চেতনা—যা সময়, স্থান, মত-পথ, সম্প্রদায় পেরিয়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দুই মহামানবের স্মরণ
আশুরার দিনে ইসলামের ইতিহাসে দুইজন মহান পুরুষের ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে জড়িত—নবী মূসা (আ.) এবং ইমাম হোসাইন (রা.)। এদের একজন যুগ যুগ ধরে আল্লাহর রাহে নেতৃত্বের প্রতীক, অপরজন সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ নিদর্শন।
১. নবী মূসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনা
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। কারণ, এই দিনেই হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। ফেরাউন অত্যন্ত অহংকারী শাসক ছিল, যে নিজেকে খোদা দাবি করত। আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আ.) তাঁর জাতিকে নিয়ে নীল নদ পার হওয়ার সময় ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেন। আর এই অলৌকিক মুক্তির ঘটনাটি ঘটেছিল আশুরার দিনেই।
রাসূল (সা.) তখন বলেছিলেন, “আমি মূসার চেয়ে বেশি তাঁর অনুসারী।” তিনি নিজেও এই দিনে রোজা রাখেন এবং মুসলিমদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন। ফলে, আশুরা মুসলমানদের কাছে শুধুমাত্র শোক নয়, বরং মুক্তির, আল্লাহর সাহায্যের এবং ন্যায়ের বিজয়ের দিন হিসেবেও পরিচিত।

২. ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ: কারবালার নির্মম সত্য
আশুরার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত আরেকটি মহান ঘটনা হলো ৬১ হিজরির কারবালার ট্র্যাজেডি। ঘটনাস্থল বর্তমান ইরাকের কারবালা। এখানে নবী মুহাম্মদের (সা.) দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের নিয়ে ইয়াজিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ইয়াজিদ ছিল এক স্বৈরাচারী ও ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী শাসক, যে ইসলামের নামে রাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিল। ইমাম হোসাইন সেই অন্যায়ের বৈধতা দিতে অস্বীকার করেন। ফলে, তাঁকে পরিবার-পরিজনসহ আটকে রেখে খাদ্য ও পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারবালার প্রান্তরে আশুরার দিন সকালে শুরু হয় ইতিহাসের এক ভয়ঙ্করতম হত্যাযজ্ঞ। একে একে শহিদ হন ইমামের ভাই, ছেলে, ভাগ্নে, আত্মীয়স্বজন এবং অবশেষে তিনি নিজেও শাহাদতবরণ করেন। তাঁর ৬ মাস বয়সী শিশু আলী আসগরকেও নির্মমভাবে বুকে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।
এই আত্মত্যাগ ছিল কেবল একটি ব্যক্তি বা পরিবারের নয়, বরং এটি ছিল ন্যায়, সত্য, ধর্ম ও মানবতার পক্ষ নেওয়ার প্রতীক। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মুখে উচ্চারিত একটি ঐতিহাসিক উক্তি আজও সময়ের দেয়ালে লিখা:
“মরণ আমার কাছে কল্যাণকর, যদি তা সত্য ও ন্যায়ের জন্য হয়। আর জীবিত থাকাও অভিশাপ, যদি তা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে হয়“।
কারবালার ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে কেবল শোকের উৎস নয়, এটি যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে। হোসাইনের ত্যাগ যেমন আমাদের কাঁদায়, তেমনি আমাদের ভিতরে সাহস ও বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
আশুরার শিক্ষা: প্রতিবাদ কখনো নীরব থাকে না
কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক ঐতিহাসিক বার্তা বহন করে: সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হলে জীবন দিতে হলেও পিছপা হওয়া যায় না। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বাণী ছিল, “অন্যায়, জুলুম ও মুনাফিকের সঙ্গে আপস নয়, বরং শহিদ হওয়া শ্রেয়।” এই চেতনাই আশুরার মূল শিক্ষা।
ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে শক্তিশালী শাসকরা সত্যকে চাপা দিতে চেয়েছে। কিন্তু হোসাইন (রা.) প্রমাণ করে দিয়েছেন—ন্যায়বিচারকে হত্যা করা যায় না, তাকে জিন্দা রাখা যায় আত্মত্যাগ দিয়ে।
আশুরা শুধুই শোক নয়, আত্মজিজ্ঞাসার দিন
শুধু চোখের জল ফেলে আশুরার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা যায় না। আমাদের প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ—আমরা কি হোসাইন (রা.)-এর পথে হাঁটছি, না কি ইয়াজিদের নীরব সমর্থক হয়ে আছি? আমরা কি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াই, নাকি সুবিধার জন্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস করি?
আজকের সমাজে দুর্নীতি, বৈষম্য, মিথ্যাচার ও অন্যায়ের যে বিস্তার, তাতে হোসাইন (রা.)-এর শিক্ষাকে আমাদের জীবনাচরণে বাস্তবায়ন করাটাই হবে প্রকৃত শোক পালন।
আশুরার পালন: আচার নয়, আচরণে হোক
আজ আমাদের দরকার এমন এক আশুরা পালন, যা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা নয়। দান-খয়রাত, রোজা কিংবা মিছিলের বাইরেও এই দিনে আমরা প্রতিজ্ঞা করতে পারি—
🔹 আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো।
🔹 দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবো না।
🔹 সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকবো।
🔹 নিজের চরিত্র গঠনে হোসাইন (রা.)-এর আদর্শকে অনুসরণ করবো।
আশুরা একটি দিনের নাম নয়, এটি একটি জীবনের দর্শন। এই দিন আমাদের শেখায়, কিছু আদর্শ এমন থাকে, যাদের জন্য মাথা কাটা যায়, কিন্তু মাথা নোয়ানো যায় না।
ইমাম হোসাইন (রা.) আমাদের সামনে রেখে গেছেন এক অবিনাশী চেতনা—যা যুগে যুগে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে গেছে, এখনো করছে।
এই আশুরায় আমরা যদি নিজের ভেতরের ইয়াজিদকে পরাজিত করে হোসাইন হয়ে উঠতে পারি—তবেই আশুরার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।








