শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আকাশছোঁয়া আত্মত্যাগ: বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে:

পুরান ঢাকার একটি ছোট্ট রাস্তা, ১০৯, আগা সাদেক রোডের “মোবারক লজ”-এ ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর জন্ম নিল এক শিশু। তার নাম রাখা হলো মতিউর রহমান। নয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ষষ্ঠ সন্তানের জন্ম। পিতার নাম মৌলভী আবদুস সামাদ, মাতার নাম সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। ছোট্ট রায়পুরার রামনগর গ্রাম, যা আজ “মতিউরনগর” নামে পরিচিত, সেই গ্রামের মাটি থেকে তার শিকড়।

ছোটবেলায় মতিউর ছিল দুঃসাহসী, জিজ্ঞাসু, আর মেধাবী। খেলার মাঠে অন্যরা ছুটোছুটি করলেও তার চোখ সবসময় থাকতো আকাশের দিকে। বাবা মায়ের স্বপ্ন—“মতিউর, আকাশ ছোঁবে একদিন।” ছোট্ট মতিউর মনে করত, আকাশ তার খেলার মাঠ, তার স্বপ্নের জায়গা।

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর সে সারগোদায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়। মেধা আর অধ্যাবসায়ে ডিস্টিংকশনসহ মেট্রিক পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয় প্রথম বিভাগে। প্রতিটি পরীক্ষার রেজাল্টে সে তার মেধার প্রমাণ দিয়েছিলো।

১৯৬১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেয় মতিউর। ১৯৬৩ সালে রিসালপুর পি.এ.এফ কলেজ থেকে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করে। এরপর, করাচির মৌরিপুর এয়ার বেজে নিযুক্ত হয়, যেখানে টি-৩৩ জেট এবং পরবর্তীতে এফ-৮৬ স্যাবর জেটের কনভার্সন কোর্স সম্পন্ন করে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করে।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ফ্লাইং অফিসার হিসেবে সে কাজ করেছিল। ১৯৬৭ সালে মিগ-১৯ বিমান চালানোর সময় যন্ত্রপাতি বিকল হলে দক্ষতার সঙ্গে প্যারাসুট যোগে মাটিতে নিরাপদ অবতরণ করে, যা তার সাহসিকতার প্রমাণ।

জানুয়ারি ১৯৭১। মতিউর দুই মাসের ছুটিতে ঢাকায় আসেন। ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি ছিলেন নরসিংদীর রায়পুরার রামনগর গ্রামে। দেশে তখন দমন আর হত্যা চলছে। মাতৃভূমি আর দেশের প্রতি ভালোবাসা তাকে অনুপ্রাণিত করল। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খুললেন। যুদ্ধ করতে আসা যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন। জনসভা করলেন, মিছিল করলেন, অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি সেনারা ভৈরব আক্রমণ করলে তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। ১৪ এপ্রিল পাক বিমান বাহিনী এফ-৮৬ স্যাবর জেট দিয়ে বোমাবর্ষণ করলেও মতিউর রহমান পূর্বেই এটি আশঙ্কা করেছিলেন। তাই ঘাঁটি পরিবর্তন করেন এবং ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তার বাহিনী।

এরপর ২৩ এপ্রিল ঢাকায় আসার পর ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান তিনি। কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। তাকে তখন বিমানের সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো।

২০ আগস্ট, ১৯৭১। করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটি। রাশেদ মিনহাজ, ২১ বছর বয়সী শিক্ষানবীশ পাইলট, দ্বিতীয়বার উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মতিউর সেখানে উপস্থিত হন, বিমান থামাতে বলেন। মিনহাজ বিমান থামান, ক্যানোপি খুলে জানতে চায় কেন। সেই সময় মতিউর ককপিটে উঠে তাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করেন। জ্ঞান হারানোর আগে রাশেদ মিনহাজ কন্ট্রোল রুমে জানাতে সক্ষম হন তিনিসহ বিমানটি হাইজ্যাক হয়েছে।

মিনহাজের বার্তা কন্ট্রোল রুমে পৌঁছায়। রাডার দেখায়—বিমান হাইজ্যাক হয়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও মতিউর বিমানকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, ভারতীয় সীমান্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রায় সীমান্তে পৌঁছাতে না পৌঁছতেই মিনহাজ জ্ঞান ফিরে পায়। বিমান নিয়ন্ত্রণে দুজনের মধ্যে সংঘাত ঘটে। ইজেক্ট সুইচ চাপলে, মতিউর প্যারাসুট ছাড়া বিমান থেকে পড়ে যান। বিমান বিধ্বস্ত হয়, তার মৃতদেহ প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়।

২০ই আগস্ট,১৯৭১ এ মতিউর রহমান এবং রাশেদ মিনহাজ স্ব স্ব দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ সরকার মতিউর রহমানকে তার সাহসী ভূমিকার জন্য বীর শ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে এবং রাশেদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে। প্রসঙ্গতঃ একই ঘটনায় দুই বিপরীত ভূমিকার জন্য দুইজনকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব প্রদানের এমন ঘটনা বিরল।

পাকিস্তান সরকার মতিউর রহমানের মৃতদেহ করাচির মাসরুর ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে সমাহিত করে। ২০০৬ সালের ২৪ জুন, বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার তত্ত্বাবধানে মতিউর রহমানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২৫ জুন ঢাকার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনরায় দাফন করা হয়।

আজও আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, এক সাহসী ছায়া উড়ে চলেছে—মাতৃভূমির জন্য, দেশের জন্য।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তার নামে যশোর বিমান ঘাঁটি নামকরণ করেছে। প্রতিটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিমানচালক তার কৃতিত্বের স্বীকৃতিতে তার নামে ট্রফি পায়।

মতিউর রহমান কেবল একজন বীর নন। তিনি এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা, স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন—দেশপ্রেম মানে ত্যাগ, সাহস এবং আত্মত্যাগ, যা চিরকাল বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করে।

আজ ২০ আগস্ট। ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো দিনটা আর পাঁচটা দিনের মতোই। কিন্তু বাংলাদেশের বুকের ভেতর এদিন এক অমর শোকের দিন, গর্বের দিন, আত্মত্যাগের দিন। সেদিন আকাশে এক পাখি উড়তে চেয়েছিল স্বাধীনতার নিশান বুকে নিয়ে। সে পাখির নাম বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।

তিনি জানতেন, ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও পাখার ঝাপটায় তিনি মাতৃভূমিকে ছুঁতে চেয়েছিলেন। তাঁর নিঃশ্বাসের শেষ বিন্দুতেও ছিল দেশপ্রেমের গান।

আজ আমরা স্বাধীনতার সুবাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নিই, আকাশের দিকে তাকিয়ে গর্বে বলি—ওই আকাশেই তো একদিন মতিউর রহমান তাঁর প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

বাঙালি জাতি আজীবন ঋণী থাকবে তাঁর কাছে। তাঁর নাম উচ্চারিত হবে শিশুর প্রথম ইতিহাস পাঠে, মায়ের lullaby-র ছন্দে, বৃদ্ধের কণ্ঠে স্মৃতির ঢেউয়ে।

মৃত্যু দিয়ে তিনি যে জীবন গড়ে দিয়েছেন, তা কখনো শেষ হবে না।
আজ, ২০ আগস্টে আমরা মাথা নত করে বলি—
“শ্রদ্ধা তোমাকে, বীরশ্রেষ্ঠ। তোমার আত্মত্যাগে বাংলাদেশ চিরকালীন।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ