(ছবি: বিমান দূর্ঘটনায় নিহত ফাতেমা আক্তার আনিশা)
হিমালয় সুমু,পথে প্রান্তরে:
ফাতেমা। বয়স নয় বছর। পড়ত মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে। ঢাকার উত্তরায় মায়ের সঙ্গে থাকত। বাবা বিদেশে—কুয়েত প্রবাসী। ভাই আছে একটা, ওমর শেখ। ওমরের বয়স ফাতেমার চেয়ে কম। ও এখন প্লে গ্রুপে পড়ে।
দুজনেই প্রতিদিন একসঙ্গে স্কুলে যেত। নিজেদের মতো করে গল্প করত, কল্পনার ভেতর হারিয়ে যেত।
সেই রুটিনেই ব্যতিক্রম ঘটল গত সোমবার (২১ জুলাই)। ওমরের জ্বর এসেছিল। তাই স্কুলে যাওয়া হয়নি ওর। কিন্তু ফাতেমা গেল। একা। আর ফিরে এল না।
সেদিন সকালবেলা দিয়াবাড়িতে মর্মান্তিক এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ছোট্ট এই মেয়েটার।
ঘটনার পর সারা দিন তাকে খুঁজেছে তার পরিবার। একেকটা হাসপাতালের বারান্দায় ছোটাছুটি করেছেন মামা স্বপন মীর। কারও মুখে সান্ত্বনা ছিল না। কারও মুখে স্পষ্ট কিছু বলার সাহসও ছিল না।
রাত ৯টার দিকে খবর এল—সিএমএইচের মর্গে আছে ফাতেমার নিথর শরীর।

পরদিন সকালে লাশ এলো বাগেরহাটের চিতলমারীর কুনিয়া গ্রামে। ফাতেমার নিজ গ্রাম। জানাজা পড়া হলো গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে। শত শত মানুষ ভিড় করল, ফাতেমাকে একনজর দেখার জন্য। কেউ কোনো কথা বলল না, শুধু চোখের পানি পড়ল থেমে থেমে।
ছোট ভাই ওমর তখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। তার সঙ্গীটা হঠাৎ করে কোথায় চলে গেল, কেন চলে গেল, সেটা বোঝার বয়স হয়নি তার। শুধু তাকিয়ে ছিল ফ্যালফ্যাল করে।
ফাতেমার দাফন হলো মাদ্রাসার পাশের কবরস্থানে। শুইয়ে দেওয়া হলো মাটির নিচে। খুব শান্তভাবে। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে ফাতেমা—সকালে উঠবে, স্কুলে যাবে, ভাইয়ের হাত ধরবে।
কিন্তু না।
এই ঘুম ভাঙবে না আর কোনোদিন।
স্কুল ব্যাগটা ঘরের এক কোণে পড়ে আছে এখনও। খাতা খোলা, পেনসিলের দাগ ছড়িয়ে আছে হিজিবিজি করে। যেন কিছু বলার ছিল, লেখা হয়নি।
এভাবে কেউ চলে গেলে, আর কিছু বলার থাকে না। শুধু একরাশ শূন্যতা থেকে যায়।
আসলে, কেউ চলে গেলে সবকিছু কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঘরের দেয়াল, জানালা, বাতাস—এমনকি সূর্যটাও মুখ গোমড়া করে বসে থাকে।
আজ আকাশের মুখও গোমড়া। যেন ফাতেমাকে হারিয়ে আকাশ নিজেও কাঁদছে।
আমরা শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। চোখে জল নিয়ে প্রার্থনা করি—
ফাতেমা, ভালো থেকো।
তোমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না।
তুমি এখন স্বর্গে ভর্তি হলে।








