,

বাবা, আমার জন্য টেনশন করো না…

হিমালয় সুমু, পথে প্রান্তরে: 

বিকেলটা অদ্ভুত রকম নিরব ছিল। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউ’র ১১ নম্বর বেডের আশেপাশে ভিড় নেই, শব্দ নেই—শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের আর যন্ত্রপাতির একটা যান্ত্রিক শব্দ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই মাহতাব রহমান ভূঁইয়ার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ—
“বাবা, আমার জন্য টেনশন করো না… আমি ঠিক হয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।”

সেই কণ্ঠ শুনে বাবার চোখে পানি এসে গেল। চোখ মোছার সময়ও তিনি জানতেন না—এটাই হয়তো ছিল তার সোনা মানিকের শেষ বলা কথা।

মাত্র ১৫ বছর বয়সের এক টুকরো স্বপ্নের নাম ছিল মাহতাব। পুরো নাম মাহতাব রহমান ভূঁইয়া। কুমিল্লার দেবিদ্বারের রাজামেহার ইউনিয়নের ছোট্ট এক গ্রাম, চুলাশ-উখারী বাজারের পাশেই যে বাড়িটা—সেখানেই জন্মেছিল সে। নামের মতোই আলোকিত, চঞ্চল আর প্রাণবন্ত ছিল সে। মাইলস্টোন স্কুলের ইংলিশ ভার্সনের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। শিক্ষার্থী কোড নম্বর ছিল—১০১৪।

একটি সাধারণ সকাল ছিল ২১ জুলাই। কেউ জানতো না, সেই সকালে ঢাকার আকাশ ছিঁড়ে নেমে আসবে অপ্রত্যাশিত এক দুঃস্বপ্ন।

সেদিন হঠাৎ করেই বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়। সব এলোমেলো হয়ে যায়। ধোঁয়া, আগুন, আর চিৎকারে পরিণত হয় ক্লাসরুম।

সেই আগুনে ঝলসে যাওয়া একটি ছেলেকে দেখা গিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিওতে—দগ্ধ শরীর নিয়ে ছুটছে, জীবনের দিকে, বাঁচার দিকে…
সেই ছেলেটিই ছিল মাহতাব।

৭০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল তার দেহ। সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পরে আশংকাজনক অবস্থায় তাকে পাঠানো হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। আইসিইউ’র ১১ নম্বর বেডে টানা চারদিন ছিল সে। চারদিন ধরে লড়েছে। নিঃশব্দে, হিমশীতল যন্ত্রের সহায়তায়।

মাহতাবের বাবার চোখে ঘুম ছিল না। মা লিপি আক্তার তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কী ঘটেছে। বড় বোন নাবিলা—যে একই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী—তাকে অদ্ভুত একটা ভারে চুপচাপ দেখাচ্ছিল। তিন বছরের ছোট বোন নাইসা বুঝেই উঠতে পারছিল না কেন সবাই কাঁদছে।

মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে, বাবাকে মাহতাব বলেছিল,
“বাবা, তুমি কেঁদো না… আমি ঠিক হয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। আর টেনশন কোরো না।”
যে কণ্ঠে ছিল সাহস, সেই কণ্ঠেই লুকানো ছিল অব্যক্ত ভয়, আর অনন্ত বিদায়ের আভাস।

২৪ জুলাই দুপুর ১টা ৫০ মিনিট।

শেষ নিঃশ্বাস ফেললো মাহতাব। চিকিৎসকেরা থেমে গেলেন, যন্ত্রপাতির সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল।
সন্ধ্যা ৭টায় মরদেহ পৌঁছাল কুমিল্লায়, নিজের গ্রামে।

রাত পৌনে ১০টায় চুলাশ-উখারী বাজার ঈদগাহ মাঠে জানাজা হলো। চারদিক নিস্তব্ধ, মানুষের মুখে কথা নেই—শুধু কান্না। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল হাসনাত খান। নামাজ পড়ান স্থানীয় ইমাম লোকমান হোসেন। সবাই যখন ‘আমিন’ বললেন, তখন কুমিল্লার আকাশও যেন ভারী হয়ে উঠেছিল।

পারিবারিক কবরস্থানে শুইয়ে দেওয়া হলো মাহতাবকে। গায়ে দেওয়া হলো শেষ চাদর। পাশে দাঁড়িয়ে বাবার চোখের পানি আর থামছিল না।
তার স্বর্ণসন্তান এখন নিথর।
যে ছেলে কিছুক্ষণ আগেও বলেছিল,
“বাবা, আমার জন্য টেনশন করো না…”

মাহতাব তিন ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার জীবন ছিল অসমাপ্ত কবিতার মতো। যার কিছু চরণ আমরা দেখলাম, বাকিগুলো থেকে গেল অদেখা। কেউ জানে না কী হতো ওর ভবিষ্যৎ—হয়তো পাইলট হতো, কিংবা একজন বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, হয়তো একজন লেখক…

একজন কিশোর তার জীবন দিয়েই বলে গেল—ভবিষ্যৎ কখনো নিশ্চিত নয়। আর জীবন—সে বড়োই দুর্বোধ্য, বড়োই সংবেদনশীল।

তবুও বলতে হয়, “মাহতাবরা মরেও মরে না।
ওরা রয়ে যায় একটা কান্নার মতো, একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। রয়ে যায় বাবার বুকে গেঁথে থাকা কথার মতো—
‘বাবা, আমার জন্য টেনশন করো না…’”

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ