আফসার রেজা, ক্রীড়া সাংবাদিক:
রাত তখন প্রায় শেষ। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু হাতিরঝিলের এম্ফিথিয়েটারে তখনও আলো জ্বলছে, শব্দ বাজছে, আর উচ্ছ্বাসে মুখরিত এক দল তরুণীর মুখ।
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে—শুধু একটা টুর্নামেন্ট নয়, এটা এক দেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সেই সাফল্য উদ্যাপনেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) এই মধ্যরাতের সংবর্ধনা।
রোববার দিবাগত রাত ২টার দিকে থাইল্যান্ড হয়ে ঢাকায় নামে নারী ফুটবল দল। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তাদের নিয়ে যাওয়া হয় হাতিরঝিলে। রাত ৩টা ১৫-তে যখন তারা এম্ফিথিয়েটারে পৌঁছান, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত হলেও, সেই মুহূর্ত ছিল একেবারে ভোরের মতো উজ্জ্বল। বাফুফের কর্মকর্তারা ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেন ফুটবলারদের। শব্দ ছিল না, কিন্তু সেই অভ্যর্থনায় ছিল হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক, উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ, বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল, নারী দলের অধিনায়ক আফিদা খন্দকার প্রান্তি, ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা এবং প্রধান কোচ পিটার বাটলার।
একজন বলছিলেন খেলার কথা, আরেকজন বলছিলেন স্বপ্ন দেখার গল্প। কোনো বক্তৃতাই আরোপিত লাগেনি। কারণ, এই মেয়েদের অর্জন এমন এক গল্প, যা নিজেই বক্তব্য তৈরি করে ফেলে।
অনেকে হয়তো অবাক হবেন—রাত ৩টার সময় সংবর্ধনা? কেন?
উত্তরটা খুব সহজ, কিন্তু আবেগময়। দলের দুই তারকা ফুটবলার ঋতুপর্ণা ও মনিকা চাকমা সোমবার ভোরেই ভুটান যাচ্ছেন। আরও তিনজন খেলোয়াড় দুদিন পর পাড়ি জমাবেন বিদেশে। পুরো দলকে একসঙ্গে পাওয়ার সময় কেবল এই মধ্যরাতটাই ছিল। সময় কম ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।
হাতিরঝিলের জলে আলো পড়ছিল তখন, যেন আকাশ নয়, মেয়েদের স্বপ্নটাই প্রতিফলিত হচ্ছিল পানিতে। এই মধ্যরাতের সংবর্ধনা যেন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক ধরনের সম্মান—যা হয়তো মেয়েদের বহু বছরের পরিশ্রম, অধ্যাবসায় ও সংগ্রামের প্রতি দেশের ভালোবাসার ছোট্ট প্রতিক্রিয়া।
একদিন হয়তো এসব গল্প লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। সেই লেখায় হয়তো থাকবে না হাতিরঝিলের রাতের হাওয়া কিংবা মেয়েদের ক্লান্ত চোখের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা উচ্ছ্বাসের আলো। কিন্তু যারা উপস্থিত ছিলেন সেদিন, তারা জানেন—এই রাতটা কেবল একটি সংবর্ধনার রাত নয়, এই রাত ছিল বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্বাক্ষী।








