শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্টার্কের শততম টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লজ্জার রেকর্ড

আফসার রেজা, ক্রীড়া প্রতিবেদক:

জ্যামাইকার আকাশে তখন নরম আলো। গোলাপি বলে দিবা-রাত্রির টেস্ট যেন একটু বেশি রঙিন হয়ে উঠেছে স্টার্কের শততম টেস্ট উপলক্ষে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান পেসারদের হাতে সে রঙিনতা আর খুব বেশি স্থায়ী হয়নি—পরিণত হয়েছে ধ্বংসযজ্ঞে।

শততম টেস্টে নেমেছেন মিচেল স্টার্ক—এটা জানত ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
কিন্তু কী ভয়ংকর রকম মরিয়া হবেন তিনি, সেটা তারা আন্দাজ করতে পারেনি।
আর আন্দাজ করলেও খুব একটা কাজে আসত না।

প্রথম ওভারে ক্যারিবিয়ান ইনিংস শুরুই হলো না, বরং শেষের ঘণ্টা যেন তখনই বাজে।
প্রথম ওভারে উইকেট তিনটি! রান শুন্য।
একটা টেস্ট ইনিংস কীভাবে শুরু হওয়া মাত্র ছিটকে পড়ে, তার সাক্ষী হয়ে থাকল ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যাবিনা পার্ক স্টেডিয়াম।

এখানে একসময় ব্রায়ান লারা খেলতেন, ব্যাট হাতে কবিতা লিখতেন।
আজ সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটাররা নামের পাশে রানও লেখাতে পারেননি। সাত ব্যাটার শূন্য রানে ফেরত।
আপনি চোখ বন্ধ করে একটা ক্রিকেট ইনিংস কল্পনা করুন, যেখানে সাতজনের পাশে লেখা ‘০’।

ক্রিকেট যখন কাব্য হয়, স্টার্ক তখন কবি নন—আগুনে লেখা এক কিংবদন্তি

মাত্র ১৫ বলে ৫ উইকেট!
এই সংখ্যা শুনে এক মুহূর্ত থমকে যেতে হয়।
এত কম বলে ‘ফাইফার’—টেস্ট ইতিহাসে আর কেউ পারেনি।

শেষে গিয়ে ফিগার দাঁড়াল—৭.৩ ওভারে ৯ রানে ৬ উইকেট।
সঙ্গে ৪০০ উইকেটের মাইলফলক—একটি শততম টেস্ট ম্যাচে আর কী চাই?
হয়তো স্টার্ক নিজেও জানেন না, এমন পারফরম্যান্স ক’জনের ভাগ্যে জোটে।

কিন্তু শুধু স্টার্কই না,
পরের ধাক্কাটা দিলেন স্কট বোল্যান্ড।
প্রথম তিন বলে হ্যাটট্রিক!
টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে হ্যাটট্রিক?
২০১০ সালের পর এবারই প্রথম।
কিন্তু এমন সময়ে, এমন ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে হ্যাটট্রিক—এ যেন সিনেমার ক্লাইম্যাক্স!

ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, কিছু ইনিংস হয়ে ওঠে ইতিহাসের অন্ধকার পাতা

ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলআউট ২৭ রানে।
২৭!

ক্রিকেটের আদি ইতিহাসে গুটিকয় ম্যাচে এমন স্কোর দেখা গেছে।
১৯৫৫ সালে অকল্যান্ডে ২৬ রানে অলআউট হয়েছিল নিউজিল্যান্ড।
৭০ বছর পর সেই রেকর্ড ভাঙতে না পারায় স্বস্তি পেতে পারে উইন্ডিজ,
কিন্তু লজ্জা কি কমলো একচুলও?

গ্যালারিতে তখন নিশ্চুপ দর্শক।
কেউ হয়তো মাথা নিচু করে বসে, কেউ হয়তো মুঠোফোনে ব্যস্ত,
কারণ এ দৃশ্য সরাসরি দেখা বুকে ব্যথা জাগায়।

একটা ইনিংসের ভেতর কতো কিছু ঘটে

স্টার্ক এক পাশে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখছেন,
বোল্যান্ড অন্য পাশে হ্যাটট্রিক তুলে নিচ্ছেন।
হ্যাজলউডও থেমে থাকেন না—তিনি তুলে নেন অধিনায়ক চেজকে।
ততক্ষণে স্কোরবোর্ড—৭ রানে ৫ উইকেট!

শেষে গিয়ে এক রান করে ২৬ থেকে বেড়ে ২৭,
নিউজিল্যান্ডের রেকর্ড ভাঙা হয়নি,
কিন্তু ক্রিকেটপ্রেমীরা জানে, ইতিহাসটা কতোটা করুণ।

এই ম্যাচের খতিয়ান

অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ২২৫
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ১৪৩
অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ১২১
লক্ষ্য: ২০৪
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ২৭ অলআউট (১৪.৩ ওভারে)

ফল: অস্ট্রেলিয়া জয়ী ১৭৬ রানে
সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৩-০ তে
ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও সিরিজ: মিচেল স্টার্ক

এই টেস্ট শুধু একটা জয় নয় অস্ট্রেলিয়ার জন্য,
এটা ছিল এক আধিপত্যের ঘোষণা।
স্টার্ক, বোল্যান্ড, হ্যাজলউড—তারা যেন বল হাতে বলছেন,
‘আমরা এখনো শেষ হয়ে যাইনি।’

আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ?
তারা হয়তো আরেকবার নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজবে।
একটা সময় ছিল, তারা দুনিয়া কাঁপাত।
আজ তারা লজ্জার তালিকায়।
এই ব্যবধান বুঝিয়ে দেয়—ক্রিকেট কতোটা নিষ্ঠুর হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ