শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জন্মদিনে স্মরণ: কার্ডিফ থেকে বিশ্বকাপে হাবিবুল বাশারের গল্প

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে:

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের ছাড়া পুরো গল্পটা কখনোই পূর্ণ হয় না। হাবিবুল বাশার সুমন সেসব নামেরই একটি। ব্যাট হাতে যেমন তিনি এক সময়ের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন, অধিনায়ক হিসেবেও তেমনি এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের রচয়িতা। আজ হাবিবুল বাশার সুমনের জন্মদিন। ১৯৭২ সালের ১৭ আগষ্ট কুষ্টিয়া জেলার নাগকান্দায় তাঁর জন্ম।

বাংলাদেশের ক্রিকেট তখনও কেবল হাঁটতে শেখা বাচ্চার মতো। বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকার লড়াই প্রতিদিন নতুন করে লড়তে হতো। এমন সময়ে ব্যাট হাতে উঠে আসেন বাশার। টেস্ট ক্রিকেটে দেশের হয়ে নামার পর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। টেস্টে দেশের প্রথম হাজার রান তাঁর ব্যাট থেকেই আসে। ৫০ টেস্ট খেলে ৩ হাজার ২৬ রানে ২৪টি অর্ধশতক, ৩টি শতক—একই সঙ্গে ধারাবাহিকতা আর আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠার প্রমাণ। ওয়ানডেতেও ১১১ ম্যাচে ২ হাজার ১৬৮ রান, সঙ্গে ১৪টি হাফ সেঞ্চুরি। ঝলমলে পরিসংখ্যান নয়, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে তখনকার বাস্তবতায় এগুলো ছিল অমূল্য। রান তোলার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উইকেটে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস আর সতীর্থদের সেই বার্তা দেওয়া যে, ‘আমরা পারি।’ বাশার সেটাই শিখিয়েছেন।

কিন্তু কেবল ব্যাট নয়, তাঁর প্রকৃত পরিচয় অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। ২০০৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য জয়, ২০০৫ সালে ভারতের বিপক্ষে দেশের মাটিতে প্রথম জয় কিংবা ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিদায়ঘণ্টা বাজানো—সব কিছুর মাঝেই ছিলেন এই শান্ত স্বভাবের মানুষটি। নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি, মাঠে অতিরিক্ত আগ্রাসন তাঁর চরিত্রে ছিল না। কিন্তু সতীর্থরা জানত, এই মানুষটার নেতৃত্বে মাঠে নামলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না।

অধিনায়ক হিসেবে ৫০ ওয়ানডে এবং ১৮ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো টেস্টে জয়ের স্বাদ পেয়েছে (২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে)। পরিসংখ্যান হয়তো বলবে, তাঁর অধিনায়কত্বে জয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু যারা কাছ থেকে দেখেছে, তারা জানে—সেই সময়ে জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরেই আসল লড়াই ছিল আত্মবিশ্বাস তৈরি করা। আর সেটাই করে দেখিয়েছেন বাশার।

আজ তিনি আর ক্রিকেট মাঠে নেই, কিন্তু ক্রিকেট থেকে দূরে-ও নন। এখনো তিনি ব্যস্ত আছেন দেশের ক্রিকেটের পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজে। যেমন করে নিজের সময়ে বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছিলেন, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মকেও দাঁড় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

হাবিবুল বাশারকে নিয়ে যত কথা বলি, ততই মনে হয়—তাঁকে হয়তো আমরা পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করতে পারব না। তাঁর আসল অবদান সংখ্যার বাইরে। তিনি ছিলেন ভরসার নাম, সাহসের প্রতীক, একজন ভদ্রলোক ক্রিকেটার, যার শান্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছে।

শুভ জন্মদিন হাবিবুল বাশার। ক্রিকেটার বাশারকে ভুলে যাওয়ার উপায় নেই, অধিনায়ক বাশারকে ভুলে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেট চিরকাল তাঁর কাছে ঋণী থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ