আফসার রেজা, ক্রীড়া প্রতিবেদক:
সফরের শুরুটা যেমন সাদাকালো ছিল, শেষটা ঠিক ততটাই রঙিন। প্রথম ম্যাচ হেরে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে সিরিজের ট্রফি হাতে নিয়েই। কলম্বোর প্রেমাদাসায় শেষ টি-টোয়েন্টিতে ৮ উইকেটের দাপুটে জয়ে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে নিজেদের করে নিয়েছে লিটন কুমার দাসের দল।
এই সংস্করণে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়। দেশের বাইরে সব মিলিয়ে পঞ্চম।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই নাম—শেখ মেহেদি হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম। একজন বল হাতে ছন্দের মহাকাব্য লিখেছেন, অন্যজন ব্যাট হাতে দেখিয়েছেন আত্মবিশ্বাস ও পরিপক্বতার মিশেল।
শেখ মেহেদির জাদু
অনেকদিন পর একাদশে ফিরে শেখ মেহেদি হাসান যেন নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার মঞ্চ পেয়েই সবটা ঢেলে দিলেন। চার ওভারে এক মেডেনসহ মাত্র ১১ রান দিয়ে ৪ উইকেট—সংখ্যার বাইরেও তার স্পেল ছিল প্রতিপক্ষের শ্বাসরোধ করে রাখার পাঠ।
পাওয়ার প্লেতে তুলে নেন কুসাল পেরেরার উইকেট, এরপর চান্দিমাল, আসালাঙ্কা আর সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক নিসাঙ্কাকেও থামিয়ে দিয়েছেন ঠান্ডা মাথায়।
মাঝেমধ্যেই এমন বোলাররা ফিরে এসে ম্যাচটা নিজেদের করে নেন। শেখ মেহেদি সেই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন আরও একবার।
তামিম নামেও আরেক তামিম
তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটিংয়ে ছিল সাহস, ছিল একরাশ আত্মবিশ্বাস।
১৩৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রথম বলেই হারায় পারভেজ হোসেনকে। চাপ তৈরি হয়। ঠিক তখনই দৃঢ়তায় ভর করে ইনিংস গড়ে তোলেন তানজিদ।
একটা সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাকে নিয়ে ছিল শুধু সম্ভাবনার কথা। আজ তিনি সম্ভাবনা থেকে বাস্তবে এসে দাঁড়িয়েছেন।
৪৭ বলে ৭৩ রানের ইনিংসে ১টি চার আর ৬টি ছক্কার মাধ্যমে ম্যাচের রংটা পুরোপুরি বাংলাদেশের করে নেন।
লিটনের সঙ্গে গড়েন ৫০ বলে ৭৪ রানের জুটি, এরপর হৃদয়ের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ৫৯ রানের পার্টনারশিপ—দুটি জুটিই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়।
তানজিদের এই ইনিংস ছিল যেন নিজের নামটা ক্রিকেটের মানচিত্রে জোরে উচ্চারণ করার প্রয়াস।
আড়ালে থাকা নায়করা
জয়টা যতটা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের, ততটাই ছিল দলের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল।
মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন চিরচেনা মুস্তাফিজ, ১৭ রানে নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ১ উইকেট।
রিশাদ, শামীম, তানজিম—সবাই যার যার জায়গা থেকে শৃঙ্খলিত বোলিং করে গেছেন।
শরিফুল ইসলাম একটু খরুচে হলেও নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ প্রথম উইকেট- কুশল মেন্ডিস।
ব্যাট হাতে লিটন কুমার দাস তার অভিজ্ঞতা দিয়ে দলকে সামনে টেনেছেন, ২৬ বলে ৩২ রানের ইনিংসটি ছিল বড় ইনিংসের ভিত গড়ার মতো।
শেষদিকে হৃদয় ছিলেন পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য। ২৫ বলে ২৭ রানে অপরাজিত থেকে দলকে পৌঁছে দিয়েছেন গন্তব্যে।
শ্রীলঙ্কার ছন্দপতন
টস জিতে ব্যাট করতে নামার পর থেকেই শ্রীলঙ্কা যেন খুঁজছিল নিজেদের।
মেহেদি আর শরিফুলের চাপে তারা পাওয়ার প্লেতেই হারায় ৩ উইকেট।
নিসাঙ্কা চেষ্টা করেছেন, তবে তাকে সঙ্গ দিতে পারেননি কেউই।
শেষদিকে দাসুন শানাকার ২৫ বলে ৩৫ রানের ইনিংস কিছুটা লড়াইয়ের পুঁজি এনে দিলেও, তা জয় এনে দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল না।
এই জয় কেবল একটি সিরিজ জয় নয়
বাংলাদেশের জন্য এই জয় শুধুই পরিসংখ্যানের খাতায় একটি ট্রফি নয়।
এটা হচ্ছে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প, নতুনদের সামনে এগিয়ে আসার গল্প।
যেখানে শেখ মেহেদি দেখালেন, সময়ের অপেক্ষা করে ফিরে আসা যায়।
তানজিদ জানিয়ে দিলেন, ভবিষ্যতের ব্যাটিং স্তম্ভ হতে তিনিও প্রস্তুত।
এই জয় সেই প্রমাণ—দলটা যখন খুঁজে পায় নিজের ছন্দ, তখন যেকোনো চ্যালেঞ্জই জয় করা যায়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
শ্রীলঙ্কা: ২০ ওভারে ১৩২/৭ (নিসাঙ্কা ৪৬, শানাকা ৩৫*; শেখ মেহেদি ৪-১-১১-৪, মুস্তাফিজ ৪-০-১৭-১)
বাংলাদেশ: ১৬.৩ ওভারে ১৩৩/২ (তানজিদ ৭৩*, লিটন ৩২, হৃদয় ২৭*)
ফল: বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী
সিরিজ: বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: শেখ মেহেদি হাসান
ম্যান অব দ্য সিরিজ: লিটন কুমার দাস








