শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৯৯.৯৪ এর জাদুকর কিংবদন্তি ব্র্যাডম্যানের জন্মদিন স্মরণ

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরেঃ 

আজ ২৭ আগস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের চিরকালীন এক নাম, এক কিংবদন্তি, যাকে ছাড়া ক্রিকেটের কোনো কাব্যই পূর্ণ হয় না—স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যানের জন্মদিন। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্ড্রা নামে ছোট্ট এক শহরে জন্ম নেওয়া ছেলেটি কীভাবে হয়ে উঠলেন বিশ্বের চোখে ক্রিকেট দেবতা, তা এখনো অবিশ্বাস্য লাগে। তার জন্মদিনে তাই আমরা ফিরে যাই সেই দিনগুলিতে, যেখানে শুরু হয়েছিল এক মহাকাব্যের গল্প।

১৯০৮ সালের এই দিনে (২৭ আগষ্ট) জন্ম নেন ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান। ক্রিকেট তখনও জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু ব্র্যাডম্যানের মতো ছেলের জন্য ক্রিকেট ছিল নেশার মতো। বাড়ির উঠোনে, দেয়ালের গায়ে টেনিস বল ছুঁড়ে, এক হাতে ব্যাট ধরে খেলতে খেলতে গড়ে উঠছিল তার চোখ ও হাতের আশ্চর্য সমন্বয়। অনেকেই বলে থাকেন, সেই ছোট্ট উঠোনে ব্যাট-বল নিয়ে খেলা ছিল তার ক্রিকেটের প্রাথমিক একাডেমি।

শৈশবের ডোনাল্ডকে দেখলে বোঝা যেত না যে তিনি একদিন ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হবেন। পরিবার ছিল সাধারণ, ধন-সম্পদ তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু স্বপ্ন ছিল অসীম। ছোটবেলায় যখন তার সমবয়সীরা খেলাধুলা, পড়াশোনায় ব্যস্ত, তখন ডোনাল্ড ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীলন করতেন। বাবা-মা কখনোই তাকে থামাননি। মা রান্নাঘরে, বাবা কাজ নিয়ে ব্যস্ত—কিন্তু বাড়ির উঠোনে ছেলের ব্যাটে টেনিস বলের শব্দ ছিল এক ধরনের সুর।

কিছুদিন পর কুটামুন্ড্রার ছোট্ট মাঠ ছেড়ে তিনি পা রাখেন বড় শহরে। সেখানেই তার প্রতিভা নজরে আসে নির্বাচকদের। ১৯২৮ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ব্র্যাডম্যান ডাক পান জাতীয় দলে। সে সময় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল কিছুটা রূপান্তরের মধ্যে ছিল। ইংল্যান্ড সফরে যেতে হবে, তরুণদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ব্র্যাডম্যান পেলেন সেই সুযোগ। প্রথম টেস্টে অবশ্য তার ব্যাট তেমন কিছু করতে পারেনি। সমালোচকরা বলেছিলেন, “খুব বড় খেলোয়াড় মনে হয় না।” কিন্তু সেই সমালোচনার জবাব তিনি দিলেন নিজের ব্যাট দিয়ে।

১৯২৮-২৯ মৌসুমে অ্যাশেজ সিরিজে তার ইনিংসই যেন ক্রিকেটের অভিধান নতুন করে লিখল। সিডনিতে ৩০০ রান পার করে যখন তিনি অপরাজিত থাকলেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি মানুষ তাকে চোখের জলে, করতালিতে অভিনন্দন জানাল। ক্রিকেট তখনো এতটা বাণিজ্যিক হয়নি, তবু সেই ইনিংস ছিল যেন মেলবোর্ন থেকে লন্ডন—সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্র। সাংবাদিকরা প্রথমবার লিখলেন: “একজন জিনিয়াসের আবির্ভাব।”

ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং ছিল অন্যরকম। কেবল টেকনিকের পরিপূর্ণতা নয়, মানসিক দৃঢ়তারও প্রতীক। তিনি বলতেন, ব্যাটিং মানে শুধু বল মারাই নয়, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতিটি বলের আগে নতুনভাবে শুরু করা। তিনি কখনো হিট করতে যেতেন না অকারণে, প্রতিটি শটের পিছনে ছিল পরিকল্পনা। এ কারণেই তিনি কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন, বোলাররা হাল ছেড়ে দিত, ফিল্ডাররা ক্লান্ত হয়ে যেত, কিন্তু ব্র্যাডম্যান ছিলেন অটল।

তার সবচেয়ে বিখ্যাত সিরিজ ছিল ১৯৩০ সালের ইংল্যান্ড সফর। সেই সিরিজে তিনি করেন ৯৭৪ রান। ভাবুন তো—মাত্র পাঁচ টেস্টে প্রায় হাজার রান! গড় প্রায় ১৪০! লর্ডস, হেডিংলি, দ্য ওভাল—সবখানে ব্র্যাডম্যান ছিলেন দর্শকদের প্রিয়। প্রতিটি বল যখন ব্যাটে লাগে, পুরো মাঠ যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। ব্র্যাডম্যান মানে ছিল ক্রিকেটের এক ভিন্ন জগৎ।

কিন্তু সব সময়ই তার পথ ছিল মসৃণ, তা নয়। ১৯৩২-৩৩ সালের ইংল্যান্ড সফর ক্রিকেট ইতিহাসে কুখ্যাত ‘Bodyline’ সিরিজ। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন, আর বোলার হ্যারল্ড লারউডরা এক নতুন কৌশল আবিষ্কার করল। শরীর লক্ষ্য করে বাউন্সার ছুঁড়ে ব্যাটসম্যানকে ভয় দেখানো। তাদের মূল টার্গেট ছিলেন ব্র্যাডম্যান। ইংলিশ সংবাদপত্রে তখন শিরোনাম—“স্টপ ব্র্যাডম্যান!” সত্যিই, সেই সিরিজে ব্র্যাডম্যানকে কষ্ট করতে হয়েছিল। প্রথম টেস্টে খেলেননি, দ্বিতীয় টেস্টে নেমে প্রথম বলেই আউট। কিন্তু তার পরেও তিনি প্রতিশোধ নিলেন নিজের মতো। একটি ইনিংসে ১০৩ রান করে প্রমাণ করলেন, কৌশল যতই কঠিন হোক, ক্রিকেট খেলোয়াড়ের সাহসকে ভাঙা যায় না।

ব্র্যাডম্যান কেবল রেকর্ড ভাঙতেন না, মানুষের হৃদয়ও জয় করতেন। মহামন্দার সময়ে, যখন অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক কষ্টে ভুগছিল, তখন তার ব্যাটিং মানুষকে আনন্দ দিত। লোকজন বলত, “ডন খেললে সব দুঃখ ভুলে যাই।” মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন বিনয়ী, সাদাসিধে। খ্যাতি তাকে বদলাতে পারেনি।

১৯৩৬ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হলেন। তার নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া নতুন দিগন্তে পৌঁছায়। সতীর্থদের উৎসাহ দিতেন, বলতেন—“টিম আগে, আমি পরে।” অধিনায়ক হিসেবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল দলকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। সবাই জানত, ডন থাকলে অস্ট্রেলিয়া কখনো হাল ছাড়বে না।

১৯৪৮ সালে এল সেই বিখ্যাত “Invincibles” দল। ব্র্যাডম্যানের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড সফরে গেল, আর এক ম্যাচও হারল না। পুরো সিরিজ অপরাজিত থেকে ফিরল। কিন্তু সেই সফরের শেষ টেস্টে ঘটল এক নাটকীয় ঘটনা। ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে তিনি যখন ব্যাট করতে নামলেন, পুরো দুনিয়া অপেক্ষা করছিল, আর মাত্র ৪ রান করলেই তার গড় হবে ১০০। ক্রিকেটের ইতিহাসে অদ্ভুত এক কীর্তি। কিন্তু ভাগ্য তার সঙ্গে রইল না। এরিক হোলিসের বলে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান আউট হলেন শূন্যতে। তার ক্যারিয়ার শেষ হলো ৯৯.৯৪ গড়ে। আজও ক্রিকেটপ্রেমীরা ভাবে—হয়তো ক্রিকেট দেবতাই চেয়েছিলেন, কিংবদন্তির গল্প এমনই অপূর্ণ থাকুক।

অবসর নেওয়ার পর তিনি ক্রিকেট থেকে পুরোপুরি দূরে যাননি। প্রশাসক, লেখক, মেন্টর—সব ভূমিকায় তিনি ছিলেন। ক্রিকেটকে নিজের সন্তানসুলভ ভালোবাসতেন। নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছিলেন, “ক্রিকেট মানে সততা, পরিশ্রম আর ধৈর্য।”

তার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল শান্ত ও পরিপূর্ণ। স্ত্রী জেসি মেনজি ছিলেন তার শক্তির উৎস। ৬৫ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছিলেন তারা। দুই সন্তান পল ও শার্লি—তাদের নিয়ে সুখী পরিবার। মাঠে তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার হিরো, ঘরে ছিলেন সাধারণ এক স্বামী আর পিতা।

২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। অস্ট্রেলিয়া যেন কেঁদেছিল সেদিন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই বলেছিল, “আমরা শুধু একজন খেলোয়াড় নয়, আমাদের আত্মার অংশ হারালাম।”

আজ তার জন্মদিনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান শুধু একজন ক্রিকেটার নন। তিনি এক অনুভূতি। তার ব্যাটিং শুধু রান নয়, ছিল জাতির আশা, ছিল প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। ক্রিকেটের ইতিহাসে অনেক রেকর্ড হয়েছে, অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, আসবেনও। কিন্তু ব্র্যাডম্যানের নাম সবসময় সবার উপরে থাকবে।

আজ ২৭ আগস্ট, স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যানের জন্মদিনে “দৈনিক পথে প্রান্তরে” পত্রিকার পক্ষ থেকে আমরা তাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা আর জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন, ডন! ক্রিকেট তোমার কাছে চিরঋণী থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ