শুক্রবার, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আকাশে বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ, ডেনমার্কে শুরু এক নতুন যুগের

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

ডেনমার্কের আকাশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে উড়েছে একটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত উড়োজাহাজ। কোনো ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার না করে এই বিমানটি ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে সন্ডারবর্গ থেকে কোপেনহেগেন পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এয়ারস্পেস কোম্পানি বেটা টেকনোলজিস নির্মিত এই উড়োজাহাজটির নাম ‘আলিয়া সিটিওএল’। দেখতে সাধারণ হলেও প্রযুক্তির দিক থেকে এটি এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি। মাত্র ১৫ মিটার ডানার বিস্তৃতি সম্পন্ন এই ছোট আকৃতির উড়োজাহাজটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৮১ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে এবং প্রতি চার্জে ৬২২ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে সক্ষম।

এই বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজটি চার্জ দেওয়া যায় সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ফাস্ট চার্জার দিয়েই, যা সম্পূর্ণ চার্জ হতে সময় নেয় মাত্র ২০ থেকে ৪০ মিনিট। তবে ইউরোপে এখনো নির্ভরযোগ্য চার্জিং অবকাঠামো না থাকায় উড়োজাহাজটি নিজের চার্জার সঙ্গে নিয়ে চলছে এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ নিচ্ছে, ফলে সময় কিছুটা বেশি লাগছে। নির্মাতা কোম্পানির দাবি, এই ফিক্সড-উইং বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজটি প্রচলিত উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের তুলনায় অধিক নিরাপদ, নিঃশব্দ এবং স্বল্প ব্যয়ে পরিচালিত। পাশাপাশি এটি প্রায় ৮৪ শতাংশ কম কার্বন নিঃসরণ করে, যা পরিবেশবান্ধব পরিবহনের সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করছে।

বেটা টেকনোলজিসের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে চার্জিং অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, ইউরোপ এখনো সে দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। কোপেনহেগেন বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহীও বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ড্যানফস ব্যাটারি সিস্টেম কোম্পানির চেয়ারম্যান মনে করছেন, আগামী এক দশকের মধ্যেই বড় আকারের বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী ব্যাটারি প্রযুক্তি বাজারে আসবে। তাঁর মতে, একবার প্রযুক্তি পরিপক্ব হয়ে গেলে, বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো দ্রুতগতিতে উন্নয়ন ঘটবে এই খাতেও।

সন্ডারবর্গ বিমানবন্দরের পরিচালক এই সফল উড্ডয়নকে ডেনমার্কের বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, অনেকেই মনে করেন সবুজ বিমান প্রযুক্তি এখনো ভবিষ্যতের বিষয়, কিন্তু আজকের এই উড্ডয়নই প্রমাণ করে দিয়েছে যে ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে উড়োজাহাজটি ইউরোপ সফরে রয়েছে। মে মাসে আয়ারল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে এটি বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে প্রদর্শনীমূলক অবতরণ করছে। আগস্টে এটি নরওয়ের বার্গেন ও স্ট্যাভেঙ্গারের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে পণ্য পরিবহন করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবলমাত্র বিদ্যুৎচালিত উড়োজাহাজ নয়, বরং টেকসই বিমান প্রযুক্তি বাস্তবায়নে হাইব্রিড, হাইড্রোজেন এবং সাস্টেইনেবল এভিয়েশন ফুয়েল—সব ধরনের বিকল্প শক্তির সমন্বয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ড্যানিশ টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের এক বিশেষজ্ঞ জানান, আমাদের একক কোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে সবকটি সম্ভাবনাকেই কাজে লাগাতে হবে।

ডেনমার্ক সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে প্রথম সম্পূর্ণ টেকসই অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব অভ্যন্তরীণ রুটকে জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য এ বছর থেকেই যাত্রীপ্রতি ১৩ ড্যানিশ ক্রোনার (প্রায় ১.৭৪ ইউরো) ফি আরোপ করা হয়েছে। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ—নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও একই পথে এগোচ্ছে। নরওয়ে ২০৪০ সালের মধ্যে সব অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটকে বৈদ্যুতিক বা হাইব্রিডে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। সুইডেন জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইটকে জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যেই সুইডেনের হার্ট অ্যারোস্পেস ৩০ আসনের ব্যাটারি চালিত প্লেন ইএস-৩০ তৈরি করছে, যা এক চার্জে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডেনমার্কের আকাশে এই বিদ্যুৎচালিত উড়োজাহাজের সফল উড্ডয়ন শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত অর্জন নয়—এটি পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং টেকসই ভবিষ্যতের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতের আকাশপথ এখন কেবল সম্ভাবনার কথা নয়, বাস্তবতার আকারেই ধরা দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ