রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্বর্ণের দামের উত্থান-পতনের নেপথ্যের গল্প

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার 

স্বর্ণ—একটি ধাতু, যার রঙে মিশে আছে সভ্যতার ইতিহাস, অর্থনীতির দর্শন এবং মানব মনস্তত্ত্বের গভীরতা। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরীয়রা যখন প্রথম স্বর্ণ খনন শুরু করে, তখন থেকেই এটি শুধু অলংকার নয়, ক্ষমতা, মর্যাদা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুগ পাল্টেছে, রাজা-বাদশাহরা বদলেছেন, কিন্তু স্বর্ণের মোহ কখনও কমেনি। বরং আধুনিক অর্থনীতিতেও স্বর্ণ আজও এক অনন্য বিনিয়োগ মাধ্যম—একটি নিরাপদ আশ্রয়।

তবে স্বর্ণের দাম সবসময় একই থাকে না। কখনও হঠাৎ বেড়ে যায়, কখনও আবার কমে আসে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় বাজারেই এই ওঠানামা নিয়মিত বিষয়। প্রশ্ন হলো—কেন এমন হয়? স্বর্ণের দামের এই উত্থান-পতনের পেছনে কোন কোন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে? আজ আমরা সে গল্পই জানব বিস্তারিতভাবে।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি: স্বর্ণ

স্বর্ণের বাজার আসলে পৃথিবীর অর্থনীতির আয়না। যখন অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকে, তখন স্বর্ণের চাহিদা কিছুটা কমে যায়। কিন্তু যখনই বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়—যুদ্ধ, মন্দা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা—তখন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ (যেমন শেয়ার বা বন্ড) থেকে অর্থ তুলে নিয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করে। কারণ ইতিহাস বলছে, স্বর্ণ কখনও সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয় না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় পুরো পৃথিবী অর্থনৈতিকভাবে কেঁপে ওঠে। সেই সময় অনেক দেশেই শেয়ারবাজার ধসে পড়ে, কিন্তু স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছায়। কারণ সবাই তখন নিরাপত্তা খুঁজছিল—যা শুধুমাত্র স্বর্ণ দিতে পারে।

ডলারের দামের প্রভাব

স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নির্ধারিত হয় মার্কিন ডলারে। ফলে ডলারের মান ওঠানামা করলে স্বর্ণের দামেও সরাসরি প্রভাব পড়ে।

যখন ডলার শক্তিশালী হয়, তখন অন্যান্য মুদ্রায় স্বর্ণ কেনা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্বজুড়ে চাহিদা কমে যায় এবং দাম কিছুটা কমে। আবার ডলারের মান কমে গেলে, স্বর্ণ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছে সস্তা হয়ে যায়। তখন চাহিদা বাড়ে, দামও বাড়ে।

এই প্রভাবটি এতটাই সরাসরি যে, অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই বলেন—“Gold moves opposite to Dollar.” অর্থাৎ, ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণ শক্তিশালী হয়, আর ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণ দুর্বল হয়।

এ সংক্রান্ত আরও পড়ুন:

https://potheprantore.com/%E0%A6%85%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF/%E0%A6%AF%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D/

চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য

অর্থনীতির সহজ সূত্র হলো—চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে, আর কমলে দামও কমে। স্বর্ণবাজারেও এর ব্যতিক্রম নেই।

বিয়ের মৌসুম, ধর্মীয় উৎসব, কিংবা বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এসব সময় স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে, বিয়েতে স্বর্ণ অলংকার অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে ধরা হয়। ফলে এসব মৌসুমে বাজারে ক্রেতার ভিড় বাড়ে, দামও লাফিয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংকটের সময় মানুষ ব্যয় কমিয়ে দেয়। তখন স্বর্ণের গয়নার চাহিদা কমে যায়, দামও কিছুটা পড়ে।

তবে শুধু ক্রেতার সংখ্যা নয়, সরবরাহও বড় ভূমিকা রাখে। স্বর্ণখনিতে উৎপাদন কমে গেলে বা পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে সরবরাহ কমে যায়। তখন বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ঘাটতি তৈরি হয়, যার ফলে দাম আবার বাড়ে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও স্বর্ণবাজার

বিশ্বের অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অংশ হিসেবে স্বর্ণ সংরক্ষণ করে। এটি মূলত এক ধরনের “অর্থনৈতিক বীমা।”

যখন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মতো শক্তিশালী অর্থনীতি অস্থিরতায় পড়ে, তখন চীন, ভারত, রাশিয়া বা তুরস্কের মতো দেশগুলো স্বর্ণ কেনার পরিমাণ বাড়ায়। এতে তাদের মুদ্রা স্থিতিশীল থাকে এবং আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় থাকে।

অন্যদিকে, কোনো দেশ যখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে এবং রিজার্ভের চাপ কমাতে স্বর্ণ বিক্রি করে, তখন বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে যেতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি পরিবর্তন স্বর্ণের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

মুদ্রাস্ফীতি: অদৃশ্য নিয়ামক

স্বর্ণের দামের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মুদ্রাস্ফীতির। যখন পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, অর্থাৎ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে, তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। তারা জানেন, কাগজের টাকার মূল্য কমতে পারে, কিন্তু স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয় না। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেলে স্বর্ণের দামও বাড়ে।

অন্যদিকে, যখন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন মানুষ আবার বিনিয়োগে ঝোঁকে—শেয়ারবাজারে, ব্যবসায়। তখন স্বর্ণের চাহিদা কমে যায়, দামও স্থিতিশীল বা কিছুটা হ্রাস পায়।

বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব

অর্থনীতি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি মানুষের আবেগেরও খেলা।

যখন বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পান—যেমন যুদ্ধের আশঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক মন্দা—তখন তারা “ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ” থেকে সরে গিয়ে “নিরাপদ আশ্রয়” হিসেবে স্বর্ণের দিকে ছুটে যান।

এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকেই অর্থনীতিবিদরা বলেন “Flight to Safety।” এই প্রবণতাই স্বর্ণের দামে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠার অন্যতম কারণ।

খনি উৎপাদন ও খরচ

স্বর্ণের যোগানের মূল উৎস হলো খনি। বিশ্বের প্রধান স্বর্ণ উৎপাদক দেশগুলো হলো চীন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকা।

খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন সহজ নয়। এতে বিশাল পরিমাণ শ্রম, প্রযুক্তি ও সময় লাগে। তাছাড়া পরিবেশগত নিয়মকানুন ও শ্রমিক ব্যয়ও ক্রমশ বাড়ছে।

যখন এসব খরচ বেড়ে যায়, তখন স্বর্ণ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। খনি কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেয়, ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে—এতে দাম বাড়ে।

যুদ্ধ, রাজনীতি ও স্বর্ণবাজার

ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ মানেই স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি। যখনই কোনো অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়—যেমন ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত বা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা—তখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেন।

এই সময় স্বর্ণের দাম হু হু করে বাড়ে। কারণ তখন কেউ জানে না, মুদ্রার মূল্য কতটা স্থিতিশীল থাকবে। এমনকি কোনো কোনো সময় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোও তাদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে স্বর্ণ কেনা বাড়িয়ে দেয়।

ডিজিটাল বাজার ও অনলাইন ট্রেডিংয়ের প্রভাব

আগে স্বর্ণ কেনাবেচা হতো বাস্তব রূপে—গয়না, কয়েন বা বার হিসেবে। এখন তা বদলে গেছে। অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখন “paper gold” বা “digital gold”-এর লেনদেন হয়।

এই অনলাইন বাজারগুলোতে বিশাল অঙ্কের টাকা প্রতিদিন হাতবদল হয়, যা বাস্তব চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে অনেক সময় দাম বাড়া-কমা কেবল “জল্পনা” বা “ধারণা” নির্ভর হয়ে পড়ে।

এই “speculative trading”-ই অনেক সময় স্বর্ণের দামে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বর্ণবাজার

বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর, কারণ এখানে স্বর্ণের নিজস্ব উৎপাদন নেই। সবই আমদানি নির্ভর।

তবে শুধু বিশ্ববাজার নয়, স্থানীয় কিছু বিষয়ও প্রভাব ফেলে—যেমন ডলারের বিনিময় হার, আমদানি শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, এবং বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা।

বিয়ের মৌসুম বা উৎসব এলেই বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও, স্থানীয় বাজারে সেই প্রভাব দেরিতে পড়ে। কারণ স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা আগের স্টকের দাম সমন্বয় করে নিতে সময় নেন।

ভবিষ্যৎ প্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভবিষ্যতেও স্বর্ণ তার ঐতিহ্য ধরে রাখবে।

বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতির ভয়, এবং ডলারের দামের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে টিকে থাকবে।

তবে স্বর্ণে বিনিয়োগের আগে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ—দাম বাড়ার সময় নয়, বরং দাম স্থিতিশীল বা সামান্য কমার সময় কিনলেই লাভবান হওয়া যায়।

স্বর্ণ—অর্থনীতির চিরন্তন প্রতীক

স্বর্ণের দাম বাড়ে বা কমে, কিন্তু এর মান কখনও পড়ে না। এটি কেবল একটি ধাতু নয়—এটি মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা এবং সভ্যতার প্রতীক।

যুদ্ধ, মহামারি বা মন্দা—সব ঝড় পেরিয়ে স্বর্ণ তার অবস্থান ধরে রেখেছে। হয়তো ভবিষ্যতেও পৃথিবীর অর্থনীতি যতই পরিবর্তন হোক, টাকার মান যতই ওঠানামা করুক, স্বর্ণের এই দীপ্তি—সে চিরকাল থাকবে অমলিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ